Header Ads Widget

Responsive Advertisement

খোলা_আকাশ

 খোলা_আকাশ...................

 সরজিৎ_ঘোষ

জয়দীপের সাথে মৌলিকার বিয়ে হয়েছে সবে পাঁচ দিন।সকালে ঘুম থেকে উঠেই মৌলিকা দেখছে পাশে জয়দীপ নেই।ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে সাতটার ঘরে।তাড়া হুড়ো করে বিছানা ছেড়ে নিচে এসে দেখছে চা তৈরি করে ততক্ষণে সার্ভ করে দিয়েছে জয়দীপ।দিবাকর আর জয়া চায়ে চুমুক দিতে দিতে বেশ হেসে হসেই কথা বলছে।মৌলিকাকে নিচে নেমে আসতে দেখে জয়দীপ বলে উঠল,

-আমি তোমার জন্যই চা নিয়ে উপরে উঠছিলাম।

মৌলিকা অপ্রস্তুত হয়ে খানিকটা লজ্জা বশত মাথা নিচু করেই বলল,

-সরি।আমি বুঝতে পারিনি এতটা দেরি হয়ে যাবে বলে।আর কখনো এরকম হবে না।

বিয়ের গন্ধ লেগে আছে মৌলিকার গায়ে তখনও।মৌলিকার মা বলে দিয়েছিল,বিয়ের পর আর দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে চলবে না।সবার আগে ঘুম থেকে উঠে পড়তে হবে।বাড়ির বৌ আর বাড়ির মেয়ের মধ্যে তফাৎ অনেক।যতটা মানিয়ে নিতে পারবি ততটাই ভালো থাকতে পারবি।

মায়ের কথাটা মনে পড়ে যেতেই মৌলিকা ভাবল সত্যিই তো,আমি এখন বাড়ির বৌ।ছি ছি।এভাবে দেরি করে ওঠা উচিত হয়নি।একটা অপরাধ বোধ কাজ করছে তখন মৌলিকার মধ্যে।

মৌলিকার কাঁচুমাচু মুখের দিকে তাকিয়ে জয়া বলে,

-সরি বলছ কেন?ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছো বলে?এতে লজ্জা পাওয়ার তো কিছু নেই বৌমা!পুরানো অভ্যাস গুলো তাড়াতাড়ি বদলাতে যেও না।

-আসলে মা সকাল সকাল উঠে আমারই চা করে দেওয়ার কথা।আমার উঠতে দেরি হয়েছে বলে ও আপনাদের চা করে দিল।আমার নিজেরই খারাপ লাগছে বেশি।

দিবাকরও মৌলিকার কথা শুনে হেসে উঠল।জয়াও হাসতে হাসতে দিবাকরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

-তোমার বৌমার কথা শুনলে? আরে বৌমা প্রতিদিন চা করার দায়িত্ব তোমার শ্বশুর মশাইয়ের ছিল।সেই দায়িত্ব আজ থেকে জয়ের।প্রতিদিন সকালের চা টা জয়ই করবে এখন থেকে।তুমি এসব নিয়ে ভাববে না একদম।বাড়ির ছেলে পড়ে পড়ে ঘুমোবে,আর বাড়ির বৌ সকাল সকাল উঠে চা করে মুখের কাছে ধরবে এমনটা আমাদের বাড়িতে হয় না।আমার শ্বশুর মশাইও তাই করতেন।তোমার শ্বশুর মশাইও এতদিন তাই করছিলেন।আর এখন থেকে জয়ও সেটাই করবে।আমার শ্বশুর মশাইয়ের আমল থেকেই চলে আসছে একটা রীতি।সকালটা বাড়ির পুরুষরা যদি একটু মধুর করে দেয় বাদবাকি দিনটা আমরা মেয়েরা মধুরতম করে তুলতে পারি।তবে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো।তুমি চাইলেও সকাল সকাল উঠতে পারো।তবে জোর জবরদস্তি কিছু নেই।

মৌলিকা শুনে তো অবাক।মৌলিকার মা যা বলে দিয়েছিল তার উল্টো প্রতিফলন চোখে পড়ল এই বাড়িতে এসে।বাপের বাড়িতে মৌলিকা দেখেছে কোন ভোরে উঠে পড়ত মা।সকালের সব কাজ সেরে চা তৈরি করে বাবার মুখে ধরত।তার আগে দাদু ঠাকুমার ঘরে চা তৈরি করে পৌঁছে দিত।ছোটো থেকে মৌলিকার ধারণা ছিল বাড়ির বৌ মানেই তাকে সবার আগে ঘুম থেকে উঠতে হয়।ধারণা পালটে গেল।তারপর থেকে মৌলিকা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সকালের চায়ের কাপটা মুখের সামনে ধরে জয়দীপ।

মৌলিকা এখন রায় বাড়ির বৌ।বাড়িতে কাজের লোক থাকলেও রান্নার দায়িত্বটা জয়ার।মৌলিকা রান্না ঘরে গিয়ে জয়াকে টুকটাক হেল্প করে দেয় কাজে।জয়া বলে,তোমাকে রান্না বান্না এখন করতে হবে না।আগে দেখো আমাদের রান্না বান্না খাওয়া দাওয়া কেমন,তারপর না হয় শিখবে।রান্না বান্না করাটা কোনো বড়  কাজ নয়।একটু দেখে নিলেই শেখা হয়ে যায়‍।তবে পড়াশোনাটা চালিয়ে যাও।কলমটাও ঠিক করে ধরতে হবে।

মৌলিকা সেভাবে রান্না শেখেনি।কলেজ পাশ করতে না করতেই বিয়ে হয়ে গেল।একটা ভয় তো ছিলই।মৌলিকার ঠাকুমা বলত,যতই এম এ বি এ রান্না ঘরের খুন্তি ধরার চাকরি করতেই হবে।শ্বশুর বাড়িতে কেউ বসিয়ে খাওয়াবে না।

কিন্তু এই বাড়িতে মৌলিকাকে খুন্তি ধরার জন্য কেউ পরামর্শ দেয় না।ঠাকুমার কথাটাও মিলল না।বরং উল্টোটাই দেখতে পেল মৌলিকা।

বিয়ের দু মাস হয়েছে।রবিবারের একটা ছুটির দিনে মৌলিকা জয়াকে বলল,

-আজ দুপুরের রান্নাটা আমি করব মা।

জয়া হেসে বলল,

-তা কি রান্না করবে শুনি?

-তুমি যা বলবে?

-রান্না করবে তুমি,আর আমি মেনু ঠিক করে দেব?

শাশুড়ি বৌমার এমন কথোপকথন শুনতে পেয়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে দিবাকর।শাশুড়ি বৌমার কথা বার্তার মধ্যে ঢুকে পড়ে দিবাকর বলে,

-দুপুরের রান্নাটা তাহলে বৌমাই করছে?বৌমা তুমি যখন ঠিক করেছো আজকের রান্নাটা তুমিই করবে,তুমি রান্না করে যা খাওয়াবে তা-ই খাব আমরা।

বিয়ের পর এই প্রথম বার রান্না করে সবাইকে খাওয়াচ্ছে।মৌলিকা রান্না করছে জেনে জয়দীপও খুব খুশি।

মৌলিকা খেতে দিয়েছে।সবাই আনন্দ করে খাচ্ছে।জয়া বলে উঠল,

-আমাদের আর  কারো কিছু লাগবে না।তুমি খেয়ে নাও এবার।

-তোমাদের সবার খাওয়া হয়ে যাক,তারপরে আমি খাব।

মৌলিকার রান্নার প্রশংসা করল জয়া।দিবাকরও বলল,মাংসটা বেশ রান্না করেছো আজ।জয়দীপও একমনে খেয়ে উঠে গেল।খেয়ে ওঠার আগে বলে গেল,বড় তৃপ্তি করে খেলাম।

মৌলিকা এবার নিজের খাবার টুকু নিয়ে খেতে বসল।নিজের রান্না খেতে গিয়ে দেখল মাংসে একদম  ঝাল হয়নি।ডালে নুন দিতে ভুলে গেছে।বাড়িতে সবাই ঝাল খেতে ভালোবাসে।ডালে যে নুন দেওয়া হয়নি সে কথা কেউই কিছু বলল না।ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল।অথচ মৌলিকা দেখেছে,মৌলিকার মা যখন রান্না করত,রান্নার একটু এদিক ওদিক হলে মৌলিকার বাবা কত কথা শোনাত।মাছের ঝোলে একদিন নুন বেশি হয়ে গিয়েছিল বাবা যা না তাই বলেছিল‌।

মৌলিকার ঠাকুমা বলেছিল,ও যেমন রান্না করছে তেমনি ওকেই সব খেতে হবে।কত খারাপ ভাষায় কথা বলেছিল ঠাকুমাও।মৌলিকার মা চুপ করে শুনে নিত সে সব কথা।রান্নার ভুল ত্রুটি হলে ওই রান্না কেউ মুখে দিত না।নতুন করে আবার রান্না করতে হত।

মৌলিকা কোনো রকমে খাওয়া দাওয়া শেষ করে জয়ার ঘরে যায়।দিবাকর তখন খাটে শুয়ে খবরের কাগজটা পড়তে শুরু করেছে।মৌলিকা ঘরে ঢুকতেই জয়া বলে,

-কিছু বলবে বৌমা?

-মাংসে একদম ঝাল হয়নি,অথচ ঝাল ছাড়া কেউই খেতে চায় না দেখি।এদিকে ডালে নুন দিতে ভুলে গেছি,অথচ তোমরা সবাই  মুখ বুজে খেয়ে নিলে,কিছুই বললে না তো?

জয়া হাসল একটু।বলল,

-মেয়ের কথা শোনো।প্রথম দিন তুমি রান্না করছো।কতটা আন্তরিকতা দিয়ে রান্না করেছো,একটু নুন কম হয়েছে,ঝাল কম হয়েছে সে জন্য তোমাকে বলব?তোমার ভালোবাসার দাম,আন্তরিকতার দাম অনেক বেশি এই সামান্য নুন ঝালের থেকেও।

খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে দিবাকর মৌলিকা কাছে ডেকে বলে,

-একটা কথা বলি।আমার কাছে এসে বসো।

মৌলিকা কাছে গিয়ে বসতেই মাথায় হাত দিয়ে বলে,

-পাগলী মেয়ে।এই জন্য মন খারাপ করে বসে আছো?আমি তো চেটেপুটে খেয়েছি।আমার পাতে কি কিছু পড়েছিল?তুমি এই যে রান্না করার জন্য চেষ্টা করেছো এটাই তো অনেক।আমি খুশি।আমাদেরকে খুশি করার জন্য তুমি তো তোমার সব টুকু দিয়েই চেষ্টা করেছো,আমরা না খুশি হয়ে পারি?

এরপর মৌলিকা নিজের ঘরে এসে জয়দীপকে যখন একই প্রশ্ন করেছিল,জয়দীপ বলল,

"কেউ যখন ভালোবেসে কারো জন্য কিছু করে সেটা ভালোবেসেই গ্রহণ করা উচিত।"

বাড়ির সকলের মুখ থেকেই একই রকম কথা শুনে  মৌলিকার মনে হয়ে ছিল এত সুখ কি কপালে সইবে?শ্বশুরবাড়ি বলে মনের মধ্যে যে ভীতির ধারণা ছিল তাহলে সেটা কি?মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি কেমন হয় তাহলে?একটা অজানা আনন্দে

মৌলিকার চোখের ভিতর শ্রাবণের ভরা নদী দু গাল প্লাবিত করে বেরিয়ে আসতে চাইছে।কোনো রকমে সামলে নেয় নিজেকে,যাতে জয়দীপ দেখে না ফেলে।

মৌলিকার ভয় ভীতি গুলো একটু একটু করে সরতে লাগল।শ্বশুর বাড়ি মানে যে ঘেরাটোপ বুঝত,আসলে তা নয়,সেটা বুঝতে পারে মৌলিকা।দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে যেন খোলা আকাশ।নিজেকে মেলে ধরার জন্য এক অবাধ স্বাধীনতা।

সেই স্বাধীনতা পেয়ে গেল মৌলিকার বিয়ের তিন মাস পর।গ্রাজুয়েশনের রেজাল্ট বের হল।মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের যখন রেজাল্ট বেরিয়েছিল মৌলিকা খুব ভালো রেজাল্ট করলেও তার ভালো রেজাল্ট নিয়ে কারো কোনো উন্মাদনা ছিল না।বাবা মা দাদু ঠাকুমা কারো মনে আনন্দের ঊচ্ছ্বাস মৌলিকা দেখেনি।মৌলিকা এই প্রথম দেখলো তার ভালো রেজাল্ট নিয়ে এই বাড়িতে একটা খুশির আমেজ।জীবনে এতটা আনন্দ এর আগে কখনো হয়নি।মৌলিকার পছন্দের খাবার গুলোই জয়া সেদিন নিজের হাতে রান্না করেছে।মৌলিকা তো অবাক।

-মা তুমি এত কিছু রান্না আমার জন্য?

জয়া হাসতে হাসতে বলল,

-তুমি পরিশ্রম করে সফল হয়েছো,এটা কম আনন্দের তো কথা নয়।আমার শাশুড়িও আমার জন্য চেষ্টা করেছিলেন অনেক।আমি চাকরি পেতে পারিনি।তাই তুমিও মাস্টার্স করবে।চাকরি করবে।তবেই আমার অপূর্ণতা দূর হবে।

মৌলিকা বিশ্বাস করতে পারছে না শাশুড়ি মা কি এই রকমও হয়?মনের মধ্যে যে সুপ্ত ইচ্ছা গুলো ছিল সে গুলো বিয়ের আগে বিসর্জন দিয়ে ফেলেছিল মৌলিকা।বাবার বাড়িতে থেকে নিজের বাবা মায়ের কাছ থেকেই তো এগুলো পাওয়ার বাসনা ভীষণ ছিল।কিন্তু সে গুলো যে কখনোই পূরণ হবে না,সেটা জেনেই বিয়ে করে সংসার জীবনে সবার মনোরঞ্জন করার জন্য নিজেকে তৈরি করে ফেলেছিল মৌলিকা।কিন্তু এই অচেনা অজানা মানুষ গুলো একটার পর একটা মনের ইচ্ছা পূরণ করতেই যেন ব্যস্ত।মৌলিকার মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্যই হয়তো বিয়েটা হয়েছে।ভগবান হয়তো সেটাই চেয়েছিলেন।মৌলিকা কখনো মুখ ফুটে মনের কথা বলতে পারেনি।তাই হয়তো ভগবান এই রকম একটা বাড়িতে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন।আনন্দে ভেসে গিয়েছিল মৌলিকা।

বারো বছর কেটে গেছে রায় বাড়িতে।মৌলিকার কাছে রায় বাড়ি একটা খোলা আকাশ।যেখানে সে পেয়েছে মুক্ত বাতাস।নিজেকে মেলতে পেরেছে খুব সহজেই।শ্বশুর বাড়ি মানে তারা কাছে এক আকাশ স্বাধীনতা।দু হাতেই সামলে চলেছে সব কিছু।যেন দশভূজা।কর্মক্ষেত্র আর সংসার ক্ষেত্র দু জায়গাতেই মেলে দিতে পেরেছে নিজেকে।শুধু কলম নয়,খুন্তি ধরতেও সে সমান পটু।শ্বশুর,শাশুড়ি,স্বামী সন্তান সব নিয়েই মৌলিকা আজ সত্যিই হয়ে উঠেছে অনন্যা।মৌলিকা আসলে শ্বশুরবাড়ি পায়নি,পেয়েছে এক খোলা আকাশ।

কলমে:সরজিৎ ঘোষ।

গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন।আরো নতুন নতুন গল্প পড়ার জন্য পেজটি লাইক করবেন।


Post a Comment

0 Comments