ফেলে আসা সময়ের জমজমাট বিয়েবাড়ি। মাইকে সানাই বাজছে হাল্কা আওয়াজে। প্রচুর আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব লোকজনের মেলা। ছাদে প্যান্ডেল করে রান্না হচ্ছে। লুচি ভাজার গন্ধ আসছে। এই সমগ্র আয়োজনের পিছনে দুচারজন মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেন। যাদের সত্যিই নাওয়া খাওয়া মাথায় ওঠে। ঘেমে নেয়ে অস্থির তারা। মেয়ের বাবা বা ছেলের বাড়ির অগাধ আস্থা এই কতিপয় মানুষদের ওপর। তারা পাড়ার দাদা, কাকা, জেঠু , বন্ধু বা কোনো নিকট আত্মীয় হতে পারেন। যারা এক অলিখিত চুক্তিতে বাঁধা থাকেন 'দায়িত্বশীলতা'। সব কিছু যখন রেডি ঠিক তখনই হাজির হয় ওই "ঘাড়ে পাউডার" দেওয়া কারুকাজ করা পাঞ্জাবি পরা কয়েকজন। যাদের কোনদিন টিকি দেখা যায়নি এই কর্মকান্ডে। এসেই শুরু "সব ঠিক করে হয়েছেতো?, মাংসের পরিমাণ, ঝাল..রসগোল্লা কম পড়বেনা তো? ইত্যাদি। "এই, কে আছিস, ইলেকট্রিকের লোকটাকে ডাক, গেটের প্রজাপতির একটা টুনি জ্বলছে না ঠিক করে, কাঁপছে।" তারা এমন ব্যস্ততার ভাব দেখাবে যেন পুরো ব্যাপারটিতে তাদের ভয়ানক একটা চিন্তা। কেউ দেখার নেই। তারা ছিল বলেই সব ঠিক ঠাক ভাবে হচ্ছে। একটু মুখ দেখিয়ে নেবে সবার কাছে। ব্যাস। কর্তব্য শেষ। নিমন্ত্রিত লোকজন তাদের নিয়ে বলবে "সত্যি! কি দায়িত্ববান এরা"
ক্লাবের ফাংশন। অনেক মেম্বার। কিন্তু সেই হাতে গোনা কয়েকজন যাবতীয় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে সবকিছু আয়োজন করে ফেলার পর ফাংশনের দিন সন্ধ্যায় "ঘাড়ে পাউডার" দিয়ে এসেই কয়েকজন বলতে শুরু করবে "এই, আর্টিস্টদের বসার ঠিক ঠাক ব্যবস্থা হয়েছে তো? চা জলখাবার? গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাউকে ডাকবে যে এ তল্লাটেই নেই। এদিক থেকে ওদিক, আবার ওদিক থেকে এদিক হনহন করে যাওয়া আসা। কি অসম্ভব ব্যস্ততা। তারপর যুতসই করে চেয়ারে বসে হাঁক দেবেন - "কইরে ভজা একটা চা দে। যেন কত কাজ শেষ করে বসেছেন। সবকিছু নির্ভিগ্নে হয়ে যাবার পর এদের আরও ডায়লগ শুরু হয়। কিন্তু সেই হাতে গোনা ঘাম ঝরানো লোকজন চলে যায় পিছনের সারিতে।
আসলে এই "ঘাড়ে পাউডার" দেওয়া ফুরফুরে লোকজন সব জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। যেখানেই অনেক জনের সমারোহে কিছু একটা ভাল কাজ হচ্ছে , সেখানেই এনাদের দেখতে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে এদের গলায় গোলাপ কিম্বা নিদেনপক্ষে গাঁদা ফুলের মালাও জুটে যায়। কিন্তু গুরুত্ব না পেলে তাদের আরও একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো খুঁজে খুঁজে খুঁত বার করা। -মাংসে আর একটু লঙ্কা দিলে কিন্তু খুব ঝাল হয়ে যেত, গেটের সামনে হ্যালোজেন লাইটটা না দিলে খুব অন্ধকার লাগতো কিম্বা ওমুক আর্টিস্টটা মান্না দের গানটা ভালই গেয়েছেন তবে আরও চড়ায় উঠলে সুর কেটে যেত"। শেষে কিছুই যদি পাওয়া না যেত বলে বসতো "সেই কবেকার পুরোনো একটা একঘেয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলো, নতুন রবীন্দ্রসঙ্গীত কি কেউ আর লিখছেনা? এ্যাঁ!
0 Comments