বিয়ের পর প্রথম ঈদ!!
শিউলিকে তুমি কোন বিবেচনায় বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দিলে মা?
যে বিবেচনায় তোর শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিয়ের পর পরই তোকে আমাদের সাথে ঈদ করার সুযোগ করে দিয়েছিল আমি সেই বিবেচনাবোধ থেকে শিউলিকে ওর বাবার বাড়িতে ঈদ করার সম্মতি দিয়েছি। শিউলি ওর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। উনাদের অভ্যস্ত হওয়ার জন্যও তো কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। আর একটা কথা, এখানে ‘অনুমতি’ শব্দটা বেশ আপত্তিজনক। শিউলি অবশ্যই আমার অধীনস্থ কর্মচারি নয়!! আমি কী তোকে বিষয়টা বোঝাতে পেরেছি রুবী?
তোর কাছে বিছিন্ন হয়েছে মনে হলেও আমি ওভাবে চিন্তা করবো না। হয়তো সমস্যা আছে। কিন্তু বৃহৎ প্রাপ্তির বিপরীতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো খুবই নগন্য। বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে। পরিক্ষায় রেজাল্টও তো বেশ ভালো করছে। আমি নিজে যদি কোন সন্তান কিংবা তাদের বউদের অনুগ্রহ-সানুগ্রহ প্রত্যাশা করতাম হবে হয়তো তোর কথাগুলো বিবেচনার সুযোগ ছিল। আমি নিজে তেত্রিশ বছর শিক্ষকতা করেছি। বাকী জীবন কাটানোর জন্য যে পরিমান অর্থের প্রয়োজন হবে সেটুকু অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ বোধহয় আমার আছে। জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার শুধু দুইটা চাওয়া। একটা হচ্ছে আমার সন্তানরা যাতে আমার শেষ দিন পর্যন্ত যতটা সম্ভব হাসিমুখে একসাথে থাকতে পারে। আরেকটি চাওয়া হচ্ছে আমি যেন সুস্থ-সবল দেহে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি।
এরমধ্যে মৃত্যু আলোচনায় আসে কিভাবে? আচ্ছা মা, তুমি কী চাও বড় দুজনের মতো শিউলিও চাকরি-বাকরি করুক?
একজন মা এবং প্রাক্তন শিক্ষিকা হিসেবে আমি অবশ্যই চাইবো শিউলি তাঁর যোগ্যতা দিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে নিক। কেননা আমি চিরদিন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের অংশগ্রহণ যত বাড়বে নারীদের দুঃখ-কষ্ট-অশান্তি ততটা লাঘব হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে শিউলির ইচ্ছা-আগ্রহ-সম্মতি এবং যোগ্যতার উপর।
তোমার সাথে যখন কথা বলি মনে হয় মায়ের সাথে নয়, কোন শিক্ষিকার সাথে কথা বলতেছি। এ বাড়ির সবাই যদি ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় তবে এতো বড় বাড়ি সামলাবে কে?
গত বছরগুলোতে যে সূত্র-তত্ত্ব-নিয়মে চলেছে ভবিষ্যতেও সে সূত্রে-তত্ত্ব-নিয়মে চলবে। কর্মব্যস্ত সংসারে আমার সন্তানেরা কী মানুষ হয়নি? আমার কিন্তু মনে হয় তোদের মরহুম বাবা এবং আমি অনেকাংশেই সফল। তোর কী মনে হয় রুবী?
আমার কী মনে হয় সেটা বলার মতো সময় এখনো উপস্থিত হয়নি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। আমার এতগুলো কথা কিন্তু তোমাকে ভালো রাখার জন্য। সারাটা জীবন তো অনেক পরিশ্রম করলে শেষ দিকে একটু আয়েশী জীবনতো প্রতাশ্যা করতেই পারো। দয়াকরে আমাকে ভুল বুঝোনা।
২.
শিউলির বড় জা ব্যাংক কর্মকর্তা। তার দুই সন্তান। ক্লাস এইট আর সিক্সে পড়ে।
মেঝ জা বুটিকের সফল ব্যবসায়ী। তার এক সন্তান। ক্লাস ফাইভে পড়ে।
এ বাড়ির অগ্রজগণ প্রকৃতই ব্যস্ত!! বন্ধের দিনগুলো বাদে দুইবেলা খাবার টেবিলে তাদের সাথে শিউলির দেখা হয় না।
তবে বন্ধের দিনগুলোতে এ বাড়ি উৎসবের চেহারা পায়। এই দুইটা দিন শ্বাশুড়ি রাহেলা বেগম তার নিজের মতো করে কাটান।
শিউলির হাজবেন্ড রাজীব বিয়ের পর পরই চাকরি বদল করেছে। বর্তমানে একটি বিদেশী মার্চেন্টডাইজিং কোম্পানীতে চাকরি করছে। বেতনসহ অন্যান্য সুবিধা সন্তোষজনক হলেও রাজীবকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় । কোনদিনই রাত দশটার আগে বাসায় আসতে পারেনা।
ঈদের কয়েকটা দিন বাকী থাকলেও রাজীব বোনাস পায়নি। শিউলির খুব ইচ্ছে সে রাজীবকে সাথে নিয়ে এ বাড়ির সবার জন্য নিজ হাতে শপিং করবে। এরমধ্যে তার বড় দুই জা শপিং শেষ করেছে।
শ্বাশুড়ি মা শিউলিকে ডেকে পাঠিয়েছে।
রাহেলা বেগম তখন বাচ্চাদের সুকুমার রায়ের ছড়া শুনাচ্ছে।
শিউলিকে দেখে তিনি বই থেকে মনোযোগ তুলে নেন। শিউলিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন- শিউলি রমিজাকে দু কাপ চা দিতে বলো। অনেকক্ষণ ধরে বই পড়ার কারণে মাথাটা ব্যথা করছে। মা-মেয়ে চা খেতে খেতে কথা বলবো।
চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে রাহেলা বেগম বলেন-
আমি চাই তুমি তোমার ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করো এবং তার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ঈদের পর হতে তুমি বাড়ির তিনটা শিশুর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিবে। তোমার কাজ হবে রুটিন করে তিনটা বাচ্চার পড়াশুনা দেখিয়ে দেয়া। অনেকটা হাউজ টিউটরদের মতো। এই কাজটা তোমার চাকরি সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগুলোতে কাজে দিবে। এতে করে তোমার যোগ্যতার বিষয়টিও সকলের গোচরে আসবে। এর বাইরে তোমার কাজ হচ্ছে প্রতিদিন নিজেকে চাকরির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলা। তোমার এই চলার পথে সার্বক্ষনিক আমাকে পাবে। মনে রেখো, যখন তুমি নিজে চাকরি করবে, নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল দেখবে তখন অনায়াসে প্রিয়জনের টেনশনগুলো নিজের মধ্যে নিয়ে নিতে পারবে। এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারেনা।
আপনার ছেলে?
আমার ছেলেকে তো আমার চেয়ে বেশী চিনো না। তবুও তোমার দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের মধ্যে যে কথাগুলো হলো তা তাকে জানানো। আমি বিশ্বাস করি রাজীবও তোমার পাশে থাকবে।
৩.
ঈদের পর হতে শিউলি তার অর্জিত সকল মেধা-জ্ঞান-প্রাজ্ঞতা দিয়ে তিনটি বাচ্চার পড়াশুনার দেখভাল করে যাচ্ছে। বাচ্চারাও ভালো রেজাল্ট করে তাকে প্রতিদান দিচ্ছে। এরমধ্যে সে দুইটি স্কুলে ইন্টারভিউ দিয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ এখনো চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেনি। যদি নিয়োগ কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত থাকে তবে যে কোন একটা স্কুলে চাকরি হয়ে যেতে পারে বলে শিউলি মনে করে। না হলেও আফসোস নেই। এখনো হাত অনেকটা সময় আছে। একটা না একটা চাকরি ঠিকই হয়ে যাবে।
গত সপ্তাহে খাবার টেবিলে মেঝ জা শ্বাশুড়ি রাহেলা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, রাজীব ভালো চাকরি করছে। আমরাও যার যার মতো পরিবারে যথেষ্ট কন্ট্রিভিউশন করে যাচ্ছি। সবমিলিয়ে আমরা তো অনেকের চাইতে ভালোই আছি। আমার মাথায় ঢুকে না তারপরও কেন শিউলি চাকরির জন্য এতোটা মরিয়া হয়ে উঠল?
গম্ভীর স্বরে রাহেলা বেগম বলেন, সাজিদও তো অনেক বড় চাকরি করছে, আজ বাংলাদেশ তো আগামিকাল থাইল্যান্ড। তারপরও কী তোমার ব্যবসা করার কোন প্রয়োজন ছিলো? স্বাভাবিক দৃষ্টিতে প্রয়োজন ‘নেই’ বলে মনে হলেও আমি কিন্তু তোমাকে উৎসাহিত করেছি। কখনো কখনো সরাসরি পাশে দাঁড়িয়েছি। আল্লাহ না করুক আজ যদি সাজিদের কিছু হয়েও যায় তুমি কিন্তু পানিতে ঢুববেনা। অথচ সেই তুমি আরেকটি মেয়ের সম্ভাব্য ক্যারিয়ার গড়ার পথে নেতিবাচক কথার পসরা নিয়ে বসছো। তুমি যেটাকে চাকরি হিসেবে দেখছো আমি কিন্তু সেটাকে কেবলমাত্র চাকরি হিসেবে দেখছি না। পার্থক্যটা দেখার কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির।
মা আপনি কিন্তু বিষয়টাকে জটিল করে ফেললেন। এই কারণে এ বাড়িতে আমি সহসা কোন কথা বলি না। অথচ ছোট-বড় অনেকেই কথা বলে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়।
তুমি যে এই কথাগুলো বলার সাহস পাচ্ছ তার পেছনে কিন্তু তোমারই অগোচরে শক্তি হিসেবে কাজ করছে তোমার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা। আর সে স্বাবলম্বীতা তোমাকে অর্জন করতে হয়েছে। পার্থক্যটা কি জানো অনেকে স্বাবলম্বী হয়ে নমনীয় হয়, আবার অনেকেরই তা হজম করতে কষ্ট হয়।
৪.
অবশেষে একটি স্কুলে শিউলির চাকরি হয়ে যায়। এরমধ্যে রাজীব এর প্রমোশন হয়েছে। সে এখন ৬ অঙ্কের বেতন পায়।
এতোকিছুর পরও মাসের শুরুতে শিউলির হাতে যখন বেতনের টাকাটা উঠে আসে তখন একধরণের প্রশান্তিতে তার মন-প্রাণ ভরে উঠে। অপ্রত্যাশিতভাবে রাহেলা বেগমের সংসারও ছোট হতে শুরু করেছে। মেঝ বউ তার ব্যবসার প্রয়োজনে শহরের অপরপ্রান্তে বাসা নিয়েছে। বাচ্চাদের স্কুল বেশ খানিকটা দূরে হওয়ায় বড় তরফ থেকেও বাসা বদলের গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। রাহেলা বেগম তার পক্ষের সম্মতি দিয়ে দিয়েছেন।
মন খারাপের সাথে পাল্লা দিয়ে রাহেলার বেগমের শরীরটাও দিন দিন খারাপ হতে থাকে। যদিও সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু আজন্ম লালিত্য অহংকারের আশু পতনের আশংকায় তার ভালো থাকার সকল আয়োজন প্রদ্বীপ শিখার ন্যায় দোদুল্যমান হয়ে যায়। সে ভাবে তবে কি পরাজয় আসন্ন?
ফলত তার নির্ঘুম রাতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। টান টান শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে আসে।
অবশেষে ব্রেইন স্ট্রোক করে রাহেলা বেগম শয্যাশায়ী। বড় এবং মেঝ তরফের অবর্তমানে সংসারের পুরো দায়িত্ব আলগোছে শিউলির কাঁধে উঠে আসে। শিউলি তার দায়িত্ব-কর্তব্যে স্থির-অবিচল।
রুবী আসে। সে ভাবে এবার আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর নেবার পালা। অসুস্থ মায়ের পাশে বসে সে সকল হিসাব চুকিয়ে নিতে চায়।
রাহেলা বেগম কিন্তু রুবীর আগমনের হেতু বুঝতে পারেন।
রাহেলা বেগম শরীর-মনের সকল জড়তা ছিন্ন করে ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে বলেন- আমি চিরদিন স্বপ্ন দেখেছি এবং অপরকে স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছি। এই ক্ষেত্রে আমি অনেকাংশেই সফল। আমার তিনজন ছেলের বউই আজ অর্থনৈতিকভাবে প্রায় স্বাবলম্বী। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে আমি ব্যর্থ এবং সে ব্যর্থতার দায় আমি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। আমি যৌথতাকে ধরে রাখতে পারিনি। তবে আমার মধ্যে কোন কষ্ট নেই। কেননা আমি কোনদিন কারও করুনা প্রত্যাশা করিনি। একটা সময় যৌথতা ভাঙ্গে আবার গড়েও উঠে। কিন্তু ভাঙ্গনটা একটু অসময়েই হয়ে গেল এই যা।
অত:পর হঠাৎ করেই রাহেলা বেগমের অবয়বে তৃপ্তির হাসি খেলে যায়।
লম্বা দম নিয়ে তিনি বলেন- এতো এতো খারাপ খবরের মধ্যেও একজন মানুষ কিন্তু এই আকালের দিনেও আমাকে ভালোবাসায় আকড়ে রেখেছে। সে তার দায়িত্ব-কর্তব্যে স্থির-অবিচল বলেই আমি এখনো তোর সাথে কথা বলতে পারছি। সে প্রয়োজনে আমাকে শাসনও করে।
কাজেই আমি ব্যর্থ মানুষ এ কথা বোধহয় পুরোপুরি ঠিক নয়।
শিউলি কী বলে জানিস!!
0 Comments